কে-ই বা ভাবে আমাকে নিয়ে?

0

স্বর্ণাভ রায়চৌধুরি: “…আমি ভালো নেই”
তাঁর শেষ হস্তাক্ষর।
কাকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন..?

বন্ধু কুণালকে ?
পরমবন্ধু গীতাকে ?

ভুবন সোমকে ?

ঋত্বিক-সত্যজিৎ -কুরশোয়া-লিতিন কে ?

না .., সময়কে ? সমাজকে ? মানুষকে ? সিনেমাকে ?
নাকি নিজেকে..?

“আশ্চর্য কিছু একটা আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে দেখে বালকটি মুখ তুলে উপরে তাকাল। উজ্জবল নীল আকাশ।”
– দ্য মাভেরিক মায়েস্ত্রো
( দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়)।

মৃণাল সেনের কাজের উপর লেখা দ্য মাভেরিক মায়েস্ত্রো; বইয়ের শুরুটা হয়েছে এভাবেই।

জীবনের সতেরোটা বছর ফরিদপুরে কাটিয়ে, সোজা কলকাতার কৈলাস বসু স্ট্রিটের এক বোর্ডিং হাউসে, মান্ধাতা আমলের বাড়ির তিন তলার ঘরে।

মফস্সল থেকে আসা আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত কিশোরের মতই কলকাতার সাথে এভাবেই প্রথম পরিচয়। যে শহরকে তিনি বলেছেন, “সারা জীবনটা এ শহরে বাস করে আমি প্রাণ পেয়েছি। উৎসাহিত হয়েছি। এমনই একটা শহরে বাস করি যে আমাকে অভিমানী করেছে। আমাকে বিরক্ত করেছে, রাগিয়ে দিয়েছে, হাসিও ফুটিয়েছে, আবার দু:খও দিয়েছে। মাঝে মাঝে খোঁচা মেরেছে, আবার আমাকে আমার ভেতরে লড়াই করার শক্তিও জুগিয়েছ”।

মৃত্যুর পূর্বে সেই শহরেই তিনি ভালো নেই। যদিও তাঁর ভালো থাকা বা না থাকায় আপনার কিছু যায় আসে না। আর একথা মৃণাল সেন নিজেও জানতেন, তা না হলে নিজেকে নিয়ে নিজের লেখা বইয়ের শেষ পাতায় তিনি লিখতেন না “কে আমি? কোথাকার কে? ক’টা মানুষ জানে আমাকে, কে-ই বা ভাবে আমাকে নিয়ে? ”
-না, তাবলে আবার একে কোনো ভাবেই তাঁর কোনো রকম আত্মশ্লাঘার স্পর্শসুখ পাওয়ার চেষ্টা ভেবে বসবেন না।
তবে এ লেখা তো ছিল তাঁর “তৃতীয় ভুবন”-এ, স্বরচিত গ্রন্থের শেষ পাতায়। কিন্তু, অফুরান জীবন শক্তির শেষ পাতার হস্তাক্ষরে..? তিনি “ভালো নেই”।

কেনো ভালো নেই তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল গবেষণা করতে পারেন। যদিও, তা কোনো কাজের বিষয় নয়,

কারণ, সে গবেষণায় তাঁকে ভালো থাকতে চাওয়ার ইচ্ছেটাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্মদিন আর মৃত্যুদিন এলেই স্মৃতিচারণের নামে আদিখ্যেতার উৎসব শুরু হয়।
চলে, তাদের খামচে ধরে একটু জাতে ওঠার চেষ্টা। ঈশ্বরকে ধর্মবন্দি করে যেমন ভয়ের ব্যবসা চলে। তেমন ভাবেই বিশিষ্ট মানুষদেরও স্ট্যাটাস বন্দি করে চলে আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এ অভ্যাস বহু প্রাচীন, তবে অকার্যকর হলেও সহজলভ্য।
তাই একদিকে যেমন ঈশ্বরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে হিংসা চলে। তেমনই আরেকদিকে শিল্পের আশ্রয়ে শিল্পী পরিচয়ের বর্ম গলিয়ে সৃষ্টির নামে চলে অবিরাম অনুকরনের মিছিল।
যেখানে সবাই মিলে লাইন দিয়ে গোল হয়ে বসে একে অপরের পিঠ চুলকে দেওয়ার প্রতিযোগীতা চালিয়ে যায়।
এটাই কালচক্র।

আসলে ইতিহাস বারবার আলোড়ন তুললেও; সেই একই জায়গায় ঘোরা ফেরা করে, তার উপকরণ খুব সীমিত। শুধু উপাদান গুলোর চরিত্র বদলায়।

আর এক একটা আলোড়ন এক এক সময় এক একটা নতুন চরিত্র হয়ে আসে। নতুন চরিত্র মানেই আরেকটা অনুকরনের উপাদান, আর একটা খামচে ধরার সুযোগ। জাতে ওঠার রাস্তা।

 

তিনি বিয়াল্লিশের দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, আমলাশোলও দেখেলেন।
তিনি আটচল্লিশের যুদ্ধ দেখেছেন, কার্গিলও দেখেলেন।
তিনি ছেচল্লিশের দাঙ্গা দেখেছন, বিরানব্বইয়ের দাঙ্গা দেখলেন।
তিনি ফ্যাসিজিমের মৃত্যু দেখেছেন, ফ্যাসিজিনের পুর্নজন্মও দেখলেন।

শুধু তিনি কেনো, সমসাময়িক প্রত্যেকটা মানুষ দেখেছে… এবং বর্তমান আগামীতেও দেখবে।
যাঁরা দেখবেন তাঁরা কি ভালো আছেন।
হঠাৎ পরিচিত কারো সাথে দেখা হলেই বহুকাঙ্খিত সেই কমন প্রশ্ন,
“ভালো আছেন?”

এই কাঙ্খিত প্রশ্নের নেপথ্যে কারণটা কি..? কখনও ভেবে দেখার অবকাশ হয়েছে..?

আমরা আদৌ কি নিয়ে ভালো থাকব..? ভালো থাকার উপাদান কি আছে…?
আমরা কি দিয়ে ভালো রাখব..? আগামীকে..?
ভালো রাখার উপাদান কি আছে..?

বারবার নিজেই নিজেকে ভেঙেছেন। নিজেকে গড়েছেন।
ফর্ম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট তাঁর ফেভারিট। শেষ মুহূর্তেও কি সেই এক্সপেরিমেন্টই চলছিল..?
একান্তে..?
ক্যামেরা ছাড়া, রিল ছাড়া, চিরিত্র ছাড়া…
শুধু পেন আর কাগজেই কি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পদৈর্ঘের চিত্ররূপে সবচেয়ে দীর্ঘ প্রশ্নটা দর্শকদের মুখে ছুঁড়ে দিলেন…

পৃথিবী ভাঙছে
পুড়ছে
ছিন্নভিন্ন হচ্ছে

তবু মানুষ বেঁচে বর্তে থাকে
মমত্বে
ভালোবাসায়
সহমর্মিতায়
-মৃণাল সেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here