প্রযোজক যত বড় হন ততই তিনি তাঁর গোঁড়ামি নিয়ে কম বাড়াবাড়ি করেন: সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস ২৪।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll তিন ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন: আপনার ছবির শিল্পবোধ নিয়ে বিদেশে কি কোনো রকম বাঁধার সম্মুখিন হয়েছেন?

সত্যজিৎ রায়: বিদেশ সম্বন্ধে চিন্তার কারণ আছে। ওদেশের সমালোচক সম্বন্ধে মাঝে মাঝে মনে হয় যে, বাঙালির জীবনের ছোট ছোট সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো ওরা ধরতে পারে না। তাই চারুলতা সম্পর্কে কেনেথ টাইনানের মত সমালোচকও অতিরিক্ত সংযমের নালিশ তুলেছেন; আমাকে হয়ত গোঁড়া রক্ষণশীল ভেবে বসেছেন। অথচ আমি অমল ও চারুর সম্পর্কে যেটুকু দেখিয়েছি, সেটুকুই বাংলাদেশের মানুষের কাছে কতখানি, তা টাইনান বুঝবেন কি করে? আমাদের জীবনের মৌলিক সামাজিক চেহারা ও জীবনধারার ধরন না জানা থাকায় ওরা ছবির অনেক সূক্ষ্ম দিকই ধরতে পারছে না।

সরলতা ও সহজবোধ্যতাকে মহৎ শিল্পের প্রথম শর্ত বলে আমি আদৌ মানি না: সত্যজিৎ রায়।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll পর্ব ll এক ll  

প্রশ্ন: বিদেশে ছবি চলা বা না চলার ব্যাপারে সমালোচকের কোনো হাত আছে কি?

সত্যজিৎ রায়: এই প্রসঙ্গে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। নিউ ইয়র্কে ছবির বাজারে প্রায় সকলেই বিশ্বাস করতেন যে, নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার চিত্র-সমালোচক বজলি ক্রাউদারের মতামতের উপর সাধারণত ছবির আয়ু একান্তভাবে নির্ভর করে। নিউ ইয়র্কে যখন পথের পাঁচালি মুক্তি পেল, তখন ক্রাউদার লিখেছিলেন, “এ ছবি পাশ্চাত্য সমাজে অপাঙক্তেও।” পথের পাঁচালি ছবির পরিবেশনের সাথে যারা যুক্ত ছিলেন, তাঁরা সকলেই প্রমাদ গুনেছিলেন। অথচ পথের পাঁচালিই শেষ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক শহরেই চলেছিল চৌত্রিশ সপ্তাহ।
পরবর্তী কালে এই ক্রাউদার মহাশয় সম্ভবত এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করেছিলেন। তার পরের বছর আমার দ্বিতীয় ছবি অপরাজিত মুক্তি পেয়েছিল এবং ক্রাউদার সেই ছবির ভূয়সী প্রশংশা করেছিলেন। অথচ অপরাজিত চলেছিল মাত্র আট সপ্তাহ।

আমি এদের এক্সপ্লয়েট করি: সত্যজিৎ রায় ll

সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll 
পর্ব ll দুই ll

প্রশ্ন: পাশ্চাত্ব সমালোচকদের চোখে এখানকার চিত্রনির্মাতারা কিভাবে ধরা দেয় বলে আপনার মনে হয়।

সত্যজিৎ রায়: সমালোচকদের কাছে চিত্রনির্মাতাদের একটু কম স্বস্তিবোধ হয়, কারণ তাঁরা অনেক সময় চিত্রনির্মাতার কাজের মধ্যে তাঁর চেয়েও অতিরিক্ত কিছু একটা খুঁজে পেয়ে থাকেন। ফলে আপনি এমন অবস্থায় পড়েন যে, একমাত্র তাঁদের চোখে আপনার কাজের মূল্য কমাবার ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের ভ্রান্তি দূর করতে পারেন।
প্রাচ্য দেশের চিত্রনির্মাতারাই বিষেশভাবে পাশ্চাত্য সমালোচকদের অতিমাত্রায় টীকাভাষ্যের উপজীব্য হয়ে থাকেন। এর দরুনই চলচ্চিত্র ভাষার দুটো দিক ধরা পরে। প্রথমত, কোনো শিল্পীর কাজের মধ্যে তাঁর সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম থাকার দরুন একটা সত্যতা আনা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, বিদেশীর পক্ষে এর রসগ্রহন করতে হলে সময়, চেষ্টা এবং রসগ্রাহিতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু, চিত্রসমালোচক এ বিষয়ে কদাচিৎ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তার কারণ অবশ্য তিনি জানেন। তাঁর কাছে কোনো প্রকাশভঙ্গীই বৈদেশিক নয়। তিনি সর্বদাই তাঁর প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রস্তুত, প্রভাব দেখাতেও প্রস্তুত এবং যেখানে কোন প্রতীক নেই সেখানেও প্রতীক দর্শনে প্রস্তুত। এরকম বিকৃত ফলাফলের উদাহরণ আছে, একবার এক ফরাসি আভাঁগার্দ (শিল্প আন্দলন বা আর্ট মুভমেন্ট) সমালোচকের; প্রথমবার এক বোম্বাই মার্কা ছবি দেখে মনে হয়েছিল, সেই ছবিতে সঙ্গীতের বিশেষ বিশেষ কিছু অংশ ব্রেখটের নি:সঙ্গতার সাথে সম্পর্কিত…

যাঁরা ফিল্মকে একমাত্র ব্যবসার উপাদান বলে মনে করেন, সেই প্রযোজকদের কাছে বরং আমি অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করি। কারণ; এখানে বেশ পরিস্কার পরিস্থিতি এবং পরিষ্কার প্রত্যুত্তর পাওয়া যায়। প্রযোজক যত বড় হন ততই তিনি তাঁর গোঁড়ামি নিয়ে কম বাড়াবাড়ি করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here