অপরাজিত ছবির ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণ খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগেনি: সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll উনিশ ll

প্রশ্ন: কাহিনী নির্বাচনের পদ্ধতিই কি ‘অপরাজিত’ ছবির ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণ হয়েছিল?

সত্যজিৎ রায়: অপরাজিত ছবির ব্যবসায়িক ব্যর্থতার কারণ খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগেনি। ছবি চলা না-চলার ব্যাপারটা আগে থেকে অনুমান করা শিবের অসাধ্য। দর্শকের সঙ্গে বসে ছবি দেখে কারণটা কিছুটা অনুমান করা যায় বটে। আমার যে কথাটা মনে হয়েছিল সেটা হল এই যে, অপু যখন বালক অবস্থা থেকে কৈশোরে উপনীত হচ্ছে, তখন তাকে একই অপু বলে মেনে নিতে দর্শকের বেশ অসুবিধা হয়। বয়সের তফাৎ তো খুব বেশি নয়- মাত্র চার বছর। অথচ যে-পরিমাণ সাদৃশ্য থাকার কথা সেটা নেই। ফলে কাহিনির সুর কেটে যেতে বাধ্য। তাছাড়া শহরের টানে অপুর মন যে সর্বজয়ার দিক থেকে সরে আসে, সেটা স্বাভাবিক হলেও, মা-ছেলের স্নেহমাখা সম্পর্কের যে-আদর্শে দর্শক অভ্যস্ত, এটা তার সঙ্গে মেলে না। এই আদর্শচ্যুতির ধাক্কা সামলে ওঠা দর্শকের পক্ষে সহজ নয়।

প্রশ্ন: ‘অপরাজিত’ ছবিতে মূল উপন্যাসের চরিত্র লীলার উপস্থিতি বাদ দেওয়াটা কি ছবির জন্য কাহিনী গত নির্বাচনের মধ্যেই এসেছে?

সত্যজিৎ রায়: লীলার অংশকে চিত্রনাট্যের আকার দিতে বেশ কসরৎ করতে হয়েছিল। চিত্রনাট্যে লীলার স্থান ছিল, অথচ তার ফলে ছবির দৈর্ঘ্য বেড়ে যাচ্ছিল। তাই আমার মনে প্রথম থেকেই লীলার চরিত্র সম্পর্কে একটা দোনামনা ভাব ছিল। পাঠকের এক পরিচিত ও প্রিয় চরিত্রকে বর্জন করার কথা ভাবতেও পারছিলাম না। আবার চরিত্রটিকে দায়সারাভাবে নাম-কা-ওয়াস্তে উপস্থিত করতেও মন চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত লীলা বাদ গেল।

কাহিনীর দিক থেকে এই চরিত্রটি খুব জরুরি কিনা সেটা সর্বাগ্রে দেখা দরকার। প্রশ্নটা যত ভাবতাম, তত মনে হত, চিত্রনাট্যে লীলাকে রাখার দরকার হচ্ছে না। অবশেষে ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, লীলার চরিত্রটি রাখব। এটা ঠিক করেছিলাম মূলত উপন্যাসের পাঠকের কথা ভেবে। পরে ভেবে দেখেছি, এটা আপোস ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রথমে লীলার ভূমিকায় যাকে ঠিক করে ফেলেছিলাম তার নাম অলকা। লীলা আর অপুকে নিয়ে প্রথম দৃশ্যটা লীলাদের বাড়িতে একটি শয়নকক্ষে তোলা হবে। দৃশ্যটি বেশ বড়। শ্যুটিংয়ের দিন ক্যামেরাটা ঠিককরে বসাতে যাব, এমন সময় খবর পেলাম, অলকার সঙ্গে দেখা করবার জন্য কে একজন নীচে অপেক্ষা করছে। অলকা ফিরে আসে পুরো দশ মিনিট বাদে। বলল, “নীচে যে এসেছে, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে। আমি ফিল্মে অভিনয় করি, এটা সে চায় না।” নীচে গিয়ে দেখলাম তিনি একজন সুপরিচিত অভিনেতা। ভদ্রলোক দুঃখপ্রকাশ করলেন বটে, কিন্তু এ-ব্যাপারে তিনি যে নরম হবেন, এমন লক্ষণ দেখা গেল না।

ছবির জন্য গল্প নির্বাচন একটা দুরূহ ব্যাপার: সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll আঠারো ll

এর থেকে আমার শিক্ষা পাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু হয়নি। এর পরে আর-একটি মেয়ের সন্ধান পাই। তন্দ্রা বর্মন। বয়স অলকারই মত। বোটালিক্যাল গার্ডেনসে পৃথিবীর বৃহত্তম বটগাছের তলায় তাকে ও স্মরণ (কিশোর অপুর ভূমিকায় অভিনয় করেন স্মরণ ঘোষাল) -কে নিয়ে গোটা কয় দৃশ্য তুলে ফেলি। তারপর রাশ্ দেখে বুঝতে পারি যে, একে দিয়ে চলবে না। মেয়েটির সঙ্গে সঙ্গে লীলার ভূমিকাও ছবি থেকে বাদ পড়ে গেল।

সম্পূর্ণ ছবি দেখার পর এ কথাও আমার মনে হয়নি যে তার ফলে সমগ্র ছবি বা অপু চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি দেখে এটা মনে হয় যে, শহরের প্রতি অপুর একটা আকর্ষণ গড়ে উঠছে যেটা তাকে তার মা-র কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। লীলার অনুপস্থিতিতেও এই আকর্ষণ স্বাভাবিক, কারণ অপুর পুরুষ বন্ধু হয়েছে এবং নাগরিক জীবন তার সামনে একটা নতুন জগৎ খুলে দিয়েছে। বরং লীলা থাকলে অপু-সর্বজয়া-লীলা মিলে একটা ত্রিকোণের সৃষ্টি হতে পারত, যেটা ছবির পক্ষে মঙ্গলকর হত বলে আমার মনে হয় না।

‘অপরাজিত’ ভালো না চলায় তৃতীয় ছবির গল্প নির্বাচন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। নতুন পথে যেতে হবে বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু সেটা কোন পথ বোঝা মুশকিল হচ্ছিল।
(ক্রমশ:)

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here