আমি চিরকালই একটা মহাকাব্য করতে চেয়েছি: সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll বাইশ ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন: আপনি যখন কোনও চিত্রনাট্য লিখছেন, তখন লেখককে হাতের কাছে পাওয়া গেলে তাঁর সঙ্গেও কি আপনি অনুরূপ আলোচনা করেন ?

সত্যজিৎ রায়: চলচ্চিত্র জীবনের শুরুতেই যাদের লেখা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, তাঁরা কেউই প্রায় জীবিত ছিলেন না। প্রথম জীবিত লেখক পরশুরাম এবং তারাশঙ্কর।
পরশুরামের ‘পরশপাথর’ নিয়ে একটা ট্রিটমেন্ট তৈরী করে তাঁর সাথে দেখা করি। আমি বলেছিলাম যে, কী ধরণের ছোটখাটো উদ্ভাবন ছবির মধ্যে আনব।
উনি তাতে অত্যন্য উদ্দীপ্ত হন। খুব খুশি হন। তারাশঙ্করের সঙ্গে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়।
তবে ছবির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের সাথে। তিনি আমার ‘মহানগর’ সম্পূর্ণ অনুমোদন করেছেন। শঙ্কর মোটের ওপর তাঁর কাহিনীর ট্রিটমেন্ট অনুমোদন করেছেন। তবে আমার মনে হয়, যে কেউই তাঁর কাহিনীর আক্ষরিক চিত্রানুবাদই পছন্দ করেন। আমি লক্ষ্য করেছি, অনুমোদন করবার সময়ও ওঁদের একটা প্রছন্ন অসন্তোষ থেকে যায়। আমি তাও লক্ষ্য করেছি। তবে এটা সবসময় সব লেখকের ক্ষেত্রে সত্য নয়। যেমন, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ তে আমার ভাষ্য সুনীলের পছন্দ হয়নি। কিন্তু, ওর লেখা থেকে পরে আমি যে ছবি করি, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ তাতে আমি যাকিছু পরিবর্তন করেছি, তাও সর্বান্ত:করণে অনুমোদন করেছে। ব্যাপারটা মোটের উপর এইভাবেই চলেছে।

প্রশ্ন: যখন রবীন্দ্রনাথ-বিভূতিভূষণের মত লেখকদের লেখা নিয়ে কাজ করছেন, আর যখন আরোও সমকালীনদের লেখা নিয়ে কাজ করছেন, তখন কি মূল রচনার প্রতি আপনার এটিটিউড অপরিবর্তিত থেকেছে ?

সত্যজিৎ রায়: পাল্টে দিয়ে মজা পাওয়া যাবে বলে কেউ মূল রচনার পরিবর্তন ঘটান না। সাধারণত যে-কোনও পরিবর্তনের আরও গভীর কোনও কারণ থাকে। আমি তো এমন একটাও উদাহরণ মনে করতে পারি না, যেখানে কোনও ক্ল্যাসিক সার্থক ভাবে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে অথচ তার আদি রূপ থেকে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থেকেছে। কারণ কোনও লেখকই চলচ্চিত্র মিডিয়ামের চরিত্রের কথা ভেবে লিখতে বসেন না। আমার তো মনে হয়, কিছু কিছু পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আমাকেও কিছু কিছু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন করতে হয়েছে। যেমন, রবীন্দ্রনাথের ‘পোষ্টমাস্টার’ গল্পের শেষে ছোট্ট রতন পোস্টমাস্টারের পায়ে পড়ে তাঁকে না যেতে মিনতি করে, বা গেলেও অন্তত তাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলে। আমার মনে হয়, এটা কেমন যেন একটু ভিক্টোরিও। আমার মনে হয়, ছবিতে এটা উপচে পড়তে পারে, আবেগের আতিশয্য মনে হতে পারে, সেন্টিমেন্টাল লাগতে পারে। তাই আমি ওকে কষ্ট দিই, আমি ওকে সেই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে দিই; ওর পায়ের কাছে না পড়েও ওকে যন্ত্রনার সেই অনুভূতির মধ্য দিয়ে আমি নিয়ে যাই। ঐ রকম পরিবর্তন করতেই হয়।

ছবির জন্য ভালো গল্প পাওয়া কঠিন: সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll একুশ ll

প্রশ্ন: আপনি থিম, স্টাইল, জঁর -এর এক বিচিত্র ব্যাপ্তি জুড়ে ছবি করেছেন। ছোটদের ছবি করেছেন, ফ্যান্টাসি, বাস্তবানুসারী ছবি করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর পরিস্থিতিনির্ভর ছবি, সত্তরের দশকের ছবি – সম্পূর্ণ পরিসর জুড়ে। আপনার কি মনে হয় এমন কোনও থিম বা স্টাইল পড়ে আছে যা আপনাকে নাড়া দেয়, অনুপ্রাণিত করে, যা নিয়ে আপনি ভবিষ্যতে কাজ করবেন বলে ভাবেন ?

সত্যজিৎ রায়: এখনও কয়েকটা কাজ করা হয়নি। যেমন, আমি চিরকালই একটা মহাকাব্য করতে চেয়েছি। ‘মহাভারত’ আমাকে মুগ্ধ করেছে, আমি এখনও ‘মহাভারত’ -এ মুগ্ধ হয়ে আছি। কিন্তু পুরো ‘মহাভারত’ সামলানো যায় বলে আমি মনে করি না। তাই হয়ত মহাকাব্যের একটা টুকরো, ‘মহাভারত’ -এর একটা টুকরো আমি করব – তাতে ব্যবহার করব আমাদের স্টাইলাইজেশনের পরম্পরা, হয়ত কথাকলি ব্যবহার করব, আমার এখনও খুব স্পষ্ট একটা ধারণা গড়ে ওঠেনি কী করব তা নিয়ে। তবে আমি নিশ্চিতই একটা মহাকাব্য করতে চাই- এমন একটা কাহিনী যা সকলেই আগে থেকেই জানে।

প্রশ্ন: ‘মহাভারত’ -এর টুকরো বলতে বিশেষ কোন টুকরো ?

সত্যজিৎ রায়: ধর, পাশা খেলা নিয়েই একটা ছবি করা যেতে পারে। কেবল, পাশা খেলা নিয়েই একটা ছবি করা যেতে পারে। কেবল, পাশা খেলাটাই একটা পুরো ছবির বিষয় হতে পারে। ‘মহাভারত’ – এর আসল সমস্যাই হল তার চরিত্রাবলী। ভারতীয় দর্শকদের কথা ভাবলে সমস্যা নেই। তারা সবাই জানে কে কর্ণ, কে ভীষ্ম। কিন্তু, এই ধরণের একটা ছবি আন্তর্জাতিক বাজারের কথা না ভাবে তৈরী করার কথা ভাবাই যায় না। সেই ক্ষেত্রে এইসব চরিত্রের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা প্রচন্ড সমস্যা সৃষ্টি করবে। কাউকে অন্তত তিনবার মামা বলে সম্বোধন না করলে সে মামা হয়ে দেখা দেবে না – এই রকম সব ব্যাপার যা বহু বছরের অভিজ্ঞতায় শিখতে হয়। তাছাড়া কোনদিন একটা লোকগাথা নিয়ে ছবি করতে চাই – একটা খাঁটি লোককাহিনী। ‘গুপি গাইন’ নয়, একটা যথার্থ লোককথা। হয়ত কোনও একটি ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে। অত্যন্ত সহজ স্টাইলে, খুবই কম সংলাপ ব্যবহার করে। আর বাংলার নিজস্ব লোকরীতি আশ্রয় করে। আরো ছোটদের ছবি করে যাব -সময় সময়। সেটা আমি জানি। আমি মনস্থির করেছি। আর হয়ত ইংরাজী ভাষায় একটি ছবি – ভারতীয়দের নিয়ে। কারণ, কোনও পরিস্থিতিতে যদি বিভিন্ন রাজ্যের কিছু মানুষ একসঙ্গে জড়ো হন, তখন ইংরাজীই তাঁদের একমাত্র ভাষা। এমনি একটা ইংরেজি ছবি, যেখানে ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হবে সৃষ্টিশীলভাবে, একজন হয়ত ভাষার ওপর তার দখল না থাকায় বাধা পাবে, আরেকজন খুবই স্বচ্ছন্দভাষী হবে, আর একজন খুবই প্রকট ভারতীয় অ্য়াকসেন্ট ব্যবহার করবে, এইরকম একটা পরিস্থিতি। এটা আমার মনের মধ্যে আছে। আমি জানি না কী হবে। এখনও কিছু বাকি আছে।

প্রশ্ন: আপনার একটা সায়েন্স ফিকশন ছবি করার ভাবনা ছিল ?

সত্যজিৎ রায়: আমি প্রচন্ড ভাবে করতে চাই। তবে সেখানে সমস্যা সুযোগ-উপকরণের। প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধার। কারণ, এখন স্ট্যানলি কুব্রিক – এর ‘2001’ ও তার পরবর্তী কিছু ছবি এমন উত্তুঙ্গ মান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এমনভাবে সায়েন্স ফিকশন ছবির সীমান্তকে বহু দূর বিস্তৃত করে দিয়েছে.., যে এখানে বসে অবশ্য ঐ জাতের ফিকশন ছবি করার প্রশ্নই উঠছে না। এই বাংলায় বসে। আমার পরিকল্পনায় যা ছিল তা হল একটা দার্শনিক স্তরের সায়েন্স ফিকশন। যাতে অতটা প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন পড়বে না। ঐ রকম একটা ছবি আমি কোনও সময় নিশ্চয়ই করতে চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here