চলচ্চিত্র কোন সাহিত্যকে অবলম্বন করে তৈরী হলেও তাঁর চরমরূপটি হবে চলচ্চিত্রের : সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll তেইশ ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন: সার্থক সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়নে শিল্পীকে কি ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়?

সত্যজিৎ রায়: একটা কথা মনে রাখা দরকার, চলচ্চিত্রের জন্য যে ধরণের সাহিত্যের প্রয়োজন তা সাহিত্য হিসাবে সব সময়ে প্রথম শ্রেণীর নাও হতে পারে। যে সাহিত্য সৃষ্টিকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে রূপ দেওয়া যেতে পারে তাকেই চলচ্চিত্র নির্মাতা পছন্দ করে থাকেন। অবশ্য অনেক মহৎ সাহিত্যেও এই গুণ পাওয়া গেছে। যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস বা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প এমন দৃশ্যধর্মী যে সেখানে সাহিত্যের প্রায় আক্ষরিক অনুসরণ করেও চলচ্চিত্রশিল্পী তার মাধ্যম বৈশিষ্ট্য অটুট রাখতে পারেন।

সাহিত্যকে চলচ্চিত্রের রূপ দিতে গেলে তাই যে প্রশ্ন প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন শিল্পীর মনে জাগে, সেটা হল এই যে – চলচ্চিত্র সাহিত্যকে অটুট রেখে নিজের ভাষায় তাকে কতদূর রূপ দিতে পারে। অনেকের ধারণা, চলচ্চিত্রের দৃশ্যধর্মী প্রকাশপন্থা সাহিত্যের ভাষাভিত্তিক শক্তি থেকে দুর্বল। আমি কিন্তু এ বিষয় তাঁদের সঙ্গে একমত হতে পারি না।অনেক সময় যে অনুভূতির প্রকাশে সাহিত্যকে অনেক কথা বলতে হয়েছে, চলচ্চিত্র তা প্রকাশ করেছে মাত্র একটি ভাবগভীর দৃশ্যপ্রতীকে। উদাহরণ হিসাবে ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের একটা দৃশ্যের উল্লেখ এখানে করা যেতে পারে। পল্লীগ্রামের বর্ধিষ্ণু পরিবারের মেয়ে অপর্ণা হঠাৎ নিঃস্ব অপুর ঘরণী হয়ে এলো। স্বভাবতই অপুর চালচুলোহীন বাসস্থানের দৃশ্য তাকে বেশ বিমর্ষ করে তোলে।

আমি চিরকালই একটা মহাকাব্য করতে চেয়েছি: সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll বাইশ ll

অপুর অনুপস্থিতিতে তার চোখে দু-চার ফোঁটা জলও পড়ে। কিন্তু তার পরেই দেখানো হয়েছে স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায়। অপর্ণা সকালে বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে দেখে অপু দুষ্টুমি করে তার আঁচলটা নিজের ধুতির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। একটু হেসে ঘুমন্ত অপুকে ছোট্ট একটা চড় কষিয়ে অপর্ণা আঁচলের গেরো খুলে বেরিয়ে যায়। এই স্বল্পকালস্থায়ী দৃশ্যটিতে সাহিত্যে বর্নিত অপু-অপর্ণার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার স্বরূপটুকু ব্যঞ্জনার ভিত্তিতে ধরা পড়েছে বলে অনেক দর্শক স্বীকার করেছেন। চলচ্চিত্র এখানে বিভূতিভূষণের কাহিনীর আক্ষরিক অনুসরণ না করেও তার নিজস্ব ইডিয়মে সাহিত্যের অভ্যন্তরীণ বক্তব্যটুকু রূপায়িত করেছে। ডেভিড লীন যখন ডিকেন্সের বিখ্যাত কীর্তি ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশন্স’ –এর চলচ্চিত্ররূপ সৃষ্টি করলেন তখন তিনি কাহিনীর বেদনাদায়ক পরিসমাপ্তি মিলনাত্মক করে তুললেন। সাহিত্যের বিশুদ্ধতা এক্ষেত্রে আহত হয়েছে বলে অনেকে হয়ত এমন মত পোষন করবেন। কিন্তু শুরু থেকে লীন যেভাবে ছবিটির গ্রন্থনা করেছেন তাতে যেন ঐ Pip ও Estella-র মধ্যে চরম মিলনই মূল সুরের সঙ্গে খাপ খেয়েছে।

সাহিত্য থেকে সরে এসেছেন বলে এখানে আমরা লীনের সঙ্গে ঝগড়াও করতে পারি, কিন্তু তিনি শিল্পী নন এ অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আমরা আনতে পারি না – কারণ চলচ্চিত্র হিসাবে ঐ পরিসমাপ্তিই ছবিটির প্রয়োজন ছিল। চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব যুগপৎ দু-দিকে। একটা সাহিত্যের কাছে, অন্যটা তাঁর নিজের শিল্পের কাছে। অনেক সময় চলচ্চিত্র কোন সাহিত্যকে অবলম্বন করে তৈরী হলেও তাঁর চরমরূপটি হবে চলচ্চিত্রের। শিল্প হিসাবে চলচ্চিত্র যেখানেই সফল সেখানেই এ-কথা প্রযোজ্য। ফোর্ড-এর ‘হাউ গ্রীণ ওয়াজ মাই ভ্যালী’ ছবি লিউয়েলিন-এর কাহিনীর মর্মকথা বিকৃত করে নি, কিন্তু তার অকুণ্ঠ প্রশংসার পিছনে আছে যথার্থ চলচ্চিত্ররূপ। একথা সত্যি যে অনেক সাহিত্যকে চলচ্চিত্রভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে মূল কাহিনীর ঘটনা বিন্যাস, এমনকি স্থানবিশেষে চরিত্রচিত্রণেও পরিচালককে বহুল পরিব্ররত্ন আনতে হয়; কিন্তু যদি আমরা তাঁর পিছনের শিল্পগত কারণ কী জানতে চেষ্টা করি তবে তা আমাদের কাছে অনেক বেশী বুদ্ধিগ্রহ্য হবে।

ছবিটি চলচ্চিত্র হিসাবে সার্থক হয়েছে কিনা সেটা হল শিল্পগত ( আস্থেটিক ) প্রশ্ন, আর ছবিটি হুবহু মূল সাহিত্যের অনুসরণ করেছে কিনা সেট আওনেকাংশে নইতিক প্রশ্ন – এবং শিল্প-উপলব্ধির ক্ষেত্রে এ দুটো প্রশ্নকে যতটা সম্ভব আলাদা রাখাই বাঞ্ছনীয়। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে শিল্পের এই নৈতিকতানিরপেক্ষ মূল্যায়ন আজও সুদূরপরাহত। তবে আমার মনে হয় সাহিত্যের চলচ্চিত্ররূপপ্রদানের সমস্যা নিয়ে ধরাবাঁধা ছকে-ফেলা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মূল কথা হল এতে কতকগুলো সাধারণ সমস্যা তো আছেই, তাছাড়া কতকগুলো সমস্যার উদ্ভব হয় যেগুলো কোন সাহিত্যবিশেষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং যেগুলোর সমাধানও পরিচালকবিশেষে পৃথক হবে। তবে যিনি সত্যই চলচ্চিত্রশিল্পী তিনি ঐ ধরণের সমস্যার সমাধান করবেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমবৈশিষ্টকে অবলম্বন করে, সিনেমাটিক্যালি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here