যে ছবি দৃশ্যকে যত বেশী ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ করতে পারে শিল্প হিসাবে তার ততই সাফল্য: সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll পঁচিশ ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও নাটকের মধ্যে প্রকৃতিগত ও শৈলীগত পার্থক্য কতটুকু এবং কোথায় ?

সত্যজিৎ রায়: প্রথমেই আমার যে কথাটা বলতে ইচ্ছে করে তা হল নাটকের যেমন সাহিত্যরূপের একটা বিশেষ মূল্য আছে, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের সে ধরনের কোন সাহিত্য মূল্য নেই, অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা থাকে না। আমরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দেখতে পাই যে অধিকাংশ সার্থক নাটক রঙ্গমঞ্চের বাইরেও সাহিত্যিকদের কাছে সবিশেষ আদৃত। শেক্সপীয়র, ইবসেন, বার্ণাড শ, ও’নীল ব্রেখট জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। অন্যপক্ষে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য মূলত একটা কাঠামো। এ জিনিস যতক্ষণ না চলচ্চিত্রের জন্ম দিচ্ছে, যতক্ষণ না চিত্রীকৃত হয়ে পর্দায় প্রতিফলিত হচ্ছে ততক্ষণ তার স্বতন্ত্র সাহিত্যগত বা শিল্পগত কোনো মূল্য নেই। যদি কোনো চিত্রনাট্য নাটক হিসাবে পড়তে ভালো লাগে সেটা চলচ্চিত্রসুলভ বৈশিষ্ট্য নয়, সে বৈশিষ্ট্য নাটকসুলভ, কারণ, অনেক চলচ্চিত্রেই নাটকের বহু বৈশিষ্ট্য এসে যায়। অবশ্য অনেকেই বলে থাকেন যে, পঠিত নাটক আর অভিনীত নাটকের মধ্যে পার্থক্য অনেক।

বিভিন্ন অভিনেতার অভিনয় ক্ষমতা, নাট্যোল্লিখিত চরিত্র বা পরিস্থিতি, বিভিন্নভাবে দর্শকচিত্তে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। তা মেনে নিয়েও আমি বলব যে বিভিন্ন ধরণের অভিনয় সম্ভবনা সত্ত্বেও নাটকের একটা স্বতন্ত্র সত্ত্বা আছে যেটা নাট্যকারের কল্পনা, তাঁর চরিত্রচিত্রণ দক্ষতার দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার সমস্ত জিনিসটি কল্পনা করেন তাঁর চরম দৃশ্যধর্মীতাকে মনশচক্ষুর সামনে রেখে।

সাহিত্যনিরপেক্ষ চলচ্চিত্রে পরিচালক অনেকটা স্বাধীন : সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll চব্বিশ ll

নাটকের চরিত্র ও ঘটনা মূলত মঞ্চের আঙ্গিকগত সসীমতার কথা মনে রেখে কল্পিত এবং রূপায়িত হয়। শেক্সপীয়র তাঁর নাটকের গভীরতা তদানীন্তন রঙ্গমঞ্চের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে অবলম্বন করেই গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু রঙ্গমঞ্চের এই বন্ধন থেকে চিত্রনাট্যকারের শিল্প বহুলাংশে মুক্ত। চলচ্চিত্র যখন জীবন অনুসরণ করে তখন তা স্থান, কাল এবং ঘটনা নির্বাচনে স্বাভাবিক জীবনকে ঘনিষ্ঠতরভাবে চিত্রীকৃত করতে পারে। আধুনিক রঙ্গমঞ্চকে সর্বদাই ঐ চতুর্থ দেওয়ালহীন পরিসরের মধ্যে যা কিছু উপস্থাপিত করতে হয়। অবশ্য এর ফলে তার শিল্পগত সংযম এবং ঘনীভবনও অনেকাংশে বাড়ে, কিন্তু তবুও অস্বীকার করা যায় না যে জীবনের বাস্তব পরিবেশসৃষ্টিতে রঙ্গমঞ্চ তার এই কনভেনশনের জন্যই অনেকটা অসুবিধায় পড়ে। চিত্রনাট্যের এদিক থেকে অনেক বেশী স্বাধীনতা এবং চলচ্চিত্র তাই সাধারণের কাছে অনেক বেশী বাহ্য বাস্তবতার বাহক।

এই প্রসংগে আর একটা কথা স্বভাবতই এসে পড়ে। নাটকের প্রধান সম্পদ এবং আকর্ষণ মঞ্চের উপর দর্শক সম্প্রদায়ের সামনে অভিনেতৃগোষ্ঠীর স্বশরীরে উপস্থিতি। চলচ্চিত্র পাহাড় দেখায়, নদনদী দেখায়, বাইরের যাবতীয় দৃশ্য চলচ্চিত্রের ক্যামেরায় আয়ত্ত থেকেও তা-যে মূলত জগতের ও মানবের ছায়া এ-বোধ দর্শকের অবচেতন মানসে যেন থেকেই যায়। তাই অনেক দ্বিতীয় শ্রেণীর নাটকেও কেবল ঐ অভিনেতাদের শারীরিক উপস্থিতি এমনভাবে দর্শকচিত্তকে প্রভাবিত করে যা অনেক বেশী বাস্তবতাসমৃদ্ধ চিত্রনাট্যের পক্ষেও আয়ত্ত করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। নাটকের উপলব্ধিতে তাই দর্শকসম্প্রদায়ের একটা বিশেষ দান আছে। শেক্সপীয়র তাঁর অপূর্ব কাব্যের মাধ্যমে যা দিলেন তাঁকে পূর্ণতর করে তুললো দর্শক মানসের উর্বরতা। চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যপক্ষে যুগপৎ জীবন-সানিধ্য এবং জীবন-দূরত্ব অনুভব না করে থাকা যায় না। বাস্তবতার দিক থেকে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের জীবনসানিধ্য নিকটতর আবার কেবলমাত্র প্রতিফলিত ছায়া হিসাবে তা জীবন থেকে অনেক দূরে।

অনেক প্রথম শ্রেণীর চিত্রনাট্যও অনেক সময় নাট্যধর্মী হয়। উদাহরণ হিসাবে আমরা হেনরী জেমসের ‘ওয়াশিংটন স্কোয়ার’ অবলম্বনে তৈরী ওয়াইলারের ‘ দ্যি এয়ারেস’, অরসন ওয়েলসের ‘সিটিজেন কেন’ প্রভৃতি চিত্রনাট্যের উল্লেখ করতে পারি। কিন্তু এইসব চিত্রনাট্যে নাট্যধর্মী সংলাপের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও দৃশ্যধর্মিতাকে সেখানে বরাবরই অধিক প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। দর্শকের শ্রবণ যখনই চলচ্চিত্রে তাঁর দর্শনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তখনই আদর্শ চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যের হানি ঘটে। তাই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য যখনই এই নতুন শিল্পের প্রয়োজন এবং বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে তাতে সংলাপ, সঙ্গীত, অভিনয় সবই দৃশ্যধর্মিতার পরিপোষক হিসাবে কাজ করেছে। এমনকি যেখানে ক্যামেরার গতিশীলতাকে অপেক্ষাকৃত সংযত ব্যবহার করা হয়েছে অর্থাৎ যেখানে চলচ্চিত্র দীর্ঘকালস্থায়ী নাট্যধর্মী পরিস্থিতিকে চিত্রিত করেছে সেখানেও দর্শকের দর্শনেন্দ্রিয়কে মুগ্ধ প্রায় হিপনোটাইস করার মত দৃশ্যগঠনের প্রয়োজন হয়েছে।

যারা ওয়াইলারের পরিচালনায় বেটি ডেভিস ও হার্বার্ট মার্শাল অভিনীত ‘লিটল ফক্সেস’ দেখেছেন তাঁরা স্বামীর মৃত্যুদৃশ্যটি মনে করলেই এ উক্তির তাৎপর্য বুঝবেন। কিম্বা যখন ইংগমার বার্গম্যান তাঁর ছবির দৃশ্য পরিকল্পনা করেন তখন অনেক সময়ে ক্যামেরাকে অতিমাত্রায় গতিশীল না করেও কেবলমাত্র ফ্রেমকে দৃশ্যধর্মিতার ভিত্তিতে দর্শকদৃষ্টি ও দর্শকমানসে প্রতিবিম্বিত করার প্রয়াস করে থাকেন।

যারা বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেন্থ শীল’ ছবিটি দেখেছেন তাঁরাই মনে করতে পারবেন মৃত্যুর ভূমিকায় Bengt Ekerot আর নাইটের ভূমিকায় Max Von Sydow -র অপূর্ব অভিনয়। এই দু’জন শিল্পীর মুখাবয়বকে কেবলমাত্র আলোকের সাহায্যে বার্গম্যান দর্শনীয় করে তুলেছেন – ক্যামেরা অনেকক্ষেত্রেই নড়েনি, অথচ সেই একই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের মুখ আলো-ছায়ার খেলায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে, আমাদের অভিভূত করেছে। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মুখ্য প্রয়াসই হল ভ্যিজুয়াল ভ্যারাইটি দিয়ে তাঁর বক্তব্যের উপস্থাপনা; যে ছবি দৃশ্যকে যত বেশী ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ করতে পারে শিল্প হিসাবে তার ততই সাফল্য। অন্যপক্ষে নাটকের ক্ষমতা তার সংলাপের অর্থঋদ্ধিতে – আঙ্গিকের যাবতীয় অভিনবত্ব আজও নাটকের এই বৈশিষ্ট্যেকে নষ্ট করতে পারেনি।