ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে সম্পূর্ণভাবে হলিউড প্রভাব মুক্ত ছিল : সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll সাতাশ ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

ঋত্বিকের সাথে সামনাসামনি পরিচয়ে হবার আগে আমি তাঁকে প্রথম চিনি নিমাই ঘোষের ছবি “ছিন্নমূল” –এর অভিনেতা হিসাবে। তাঁর আগে আমি ঋত্বিককে চোখে দেখিনি কখনও। নিমাইবাবু ছিলেন আমাদের ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির একেবারে প্রথমদিকের সভ্যদের মধ্যে একজন। তিনি যখন “ছিন্নমূল” ছবি করছেন, মাঝে মাঝে আমার কাছে আসতেন এবং ছবি সম্বন্ধে নানারকম গল্প করতেন। সেই ফাঁকে ঋত্বিকের কথাও মাঝে মাঝে উঠেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওকে একটা অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছি। ছেলেটির মধ্যে চলচ্চিত্র সম্বন্ধে প্রচুর উৎসাহ রয়েছে।’

তারপরে বেশ কিছুকাল ঋত্বিকের সঙ্গে আমার সামনাসামনি পরিচয় হয়নি। ফিল্ম সোসাইটিরই একটা মিটিংয়ে সে আসে এবং তখনই তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। ফিল্ম সোসাইটির বৈঠকে সে যে ঘন ঘন আসত তা নয়। কাজেই তখনো তাঁকে ভালো করে চেনার সুযোগ হয়নি। আমার ধারণা সে সময়টা ঋত্বিক বোধহয় নাটক এবং মঞ্চ সম্পর্কেই আরও বেশি উৎসাহিত ছিল।

আরও কিছুকাল পরে, অরোরা কোম্পানির আপিসে ঋত্বিকের সঙ্গে আমার সত্যিকারের পরিচয় হল। সে বোধহয়, যতদূর মনে পড়ে, সে সময় বোম্বেতে বিমল রায়ের সঙ্গে কাজ করছে, বিমল রায়ের ছবির চিত্রনাট্য লিখছে। তার কিছু আগে “পথের পাঁচালী” ছবি মুক্তি পেয়েছে, ঋত্বিক সে ছবি দেখেছে এবং দেখে তাঁর খুবই বেশি রকম ভালো লেগেছিল। সে কথা সে প্রাণ খুলে আমার কাছে বলে। কিন্তু আমার যে জিনিসটি সবচাইতে ভালো লেগেছিল, সেটা সে যেভাবে ছবিটাকে বিশ্লেষণ করেছিল – তার কয়েকটা দৃশ্য – সেটা থেকে আমার মনে হয়েছিল, ঋত্বিক যদি ছবি করে তাহলে সে খুব ভালোই ছবি করবে। তারও পর যখন “অপরাজিত” ছবির সম্পাদনার কাজ হচ্ছে বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে তখন শুনলাম একটি ছবির প্রিন্ট সেখানে রয়েছে । সে ছবি হল ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি “নাগরিক”। তৎক্ষণাৎ আমরা সেই ছবি দেখি। খুবই অসুবিধার মধ্যে তোলা হয়েছিল ছবিটা, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তার বাইরের পালিশ একদমই নেই বলতে গেলে, কিন্তু তাও তার মধ্যে কতকগুলো এমন গুণের পরিচয় পেয়েছিলাম যে তাতে এই নবীন পরিচালক সম্বন্ধে একটা প্রচন্ড শ্রদ্ধা জাগে আমার মনে।

তার কিছুকাল পরে “অযান্ত্রিক” ছবির আবির্ভাব। “নাগরিক” ছবি বাজারে দেখানো হয়নি। “অযান্ত্রিক” ছবির প্রথম শোতে আমি উপস্থিত ছিলাম এবং সে ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, একজন সত্যিকারের শিল্পী যদি সত্যিকারের কাজের সুযোগ পায়, তাহলে সে একধাপে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে। “অযান্ত্রিক” ছবি ব্যবসায়িকভাবে ভালো চলেনি। তার কারণটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট ছিল। ঋত্বিক বিষয়বস্তু নির্বাচনে একটা অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। ঠিক সেই জাতীয় ছবি তাঁর আগে বাংলার চলচ্চিত্র জগতে কেউ করেনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে নীরস ছবি – নায়ক বলতে একজন গাড়ির ড্রাইভার এবং নায়িকা বোধহয় সেই গাড়িটাকে বলা চলে। সেখানে সাহসের পরিচয় বলতে যেটা ছিল যে, সেই গাড়িটার মধ্যে একটা মনুষ্যত্ব আরোপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যাকে বলা যেতে পারে এক ধরণের অ্যান্থোপ্রোমর্ফিজম, সেটা যে সব জায়গায় উৎরে ছিল সেটা আমি বলব না; কিন্তু বাংলার চিত্রজগতে কাজ করতে এসে, বাংলার দর্শকদের কথা মনে রেখে একজন শিল্পী যে এটা আদৌ করবার সাহস পেয়েছে সেটাই হচ্ছে আশ্চর্যের কথা।

 

চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এখন আর কোনো স্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব নয়: সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll ছাব্বিশ ll

 

তারপরে, “অযান্ত্রিক” ছবির ক্ষেত্রে, আমার কাছে সবচেয়ে লক্ষ্য করার মতো কতকগুলো যে জিনিস ছিল, বিষয়বস্তু বাদ দিয়েও সে জিনিসটা অনেক ছবিতে পাওয়া যেতে পারে – তা হল এক ধরণের দরদ, মানবিকতা। এগুলো অনেকের ছবিতেই লক্ষ্য করা যেতে পারে, কিন্তু যে সমস্ত গুণগুলো থাকলে একটা ছবি সত্যিকারের সার্থকতা অর্জন করতে পারে সেই ধরণের; চলচ্চিত্রের কতকগুলো বিশেষ গুণ “অযান্ত্রিক” ছবির প্রায় বহু জায়গায় লক্ষ্য করা যায়। আমি কয়েকটা উদাহরণ দেব, এগুলো হচ্ছে বিশেষ করে কতকগুলো শট, যেখানে ঘটনা হয়ত কিছুই ঘটছে না। উপাদান সামান্যই কিন্তু একটা বিশেষ কনটেক্সটে এসে সেই শট এমন একটি কাব্যের পর্যায় উঠে গেছে, এমন একটা শক্তিশালী চেহারা নিয়েছে যেটা একমাত্র অত্যন্ত শক্তিশালী পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব। গাড়িটাকে নিয়ে কত কী যে করা হয়েছে।

গাড়িটা একটা লেকের ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সন্ধ্যাবেলায়। তাঁর দৃষ্টিকোণ, তাঁর কম্পোজিশন এমন আশ্চর্য, সেটা যেন একেবারে স্পষ্ট কথা বলছে। তারপর আর একটা দৃশ্যে শুধু গাড়িটার বনেট দেখা যাচ্ছে। বনেটের উপর সেই ক্যাপটা রয়েছে। ঢাকনাটা খুলে বিমল তাতে জল ঢেলে, হাত দিয়ে ঢাকনিটা তিনটে প্যাঁচে বন্ধ করে। রুক্ষ হাত দিয়ে তিনটে চাপড় মারল ভালো করে বন্ধ করার জন্য। আর কিছুই না। পিছনে আকাশ, সামনে বনেটটুকু আর বিমলের হাত। এ একটা আশ্চর্য জিনিস। তারপর এক পাগলের ব্যবহার আছে “অযান্ত্রিক” ছবিতে। দুটো যায়গায় দেখা যাবে পাগলকে, দুটো ভিন্ন জায়গায় দেখা যাবে পাগল রাস্তার ধারে বসে রয়েছে। বিমলের গাড়ি তার সামনে দিয়ে চলে গেল। একবার ধূলো উড়িয়ে গেল, তার অনেকপরে ছবিতে দেখা গেল গাড়িটা জল ছিটিয়ে গেল, কেননা বর্ষা এসে গেছে। কিম্বা হয়তো প্রথমবার জল ছিটিয়ে গেছে, দ্বিতীয়বার ধূলো উড়িয়ে গেল। কিন্তু দৃষ্টিকোণ একই, সবই এক। শুধু দু-জায়গায় দু-বার বিভিন্নভাবে এসে যেন একই গানের সুর দু-রকম ভাবে শুনতে পেলাম আমরা। এরকম আশ্চর্য জিনিস “অযান্ত্রিক” ছবির বহু যায়গায় রয়েছে।

“অযান্ত্রিক” ছবির পর ঋত্বিক মাত্র ছয়খানা ছবি করার সুযোগ পেয়েছিল। তারমধ্যে আমার পক্ষে দেখা সম্ভব হয়েছে মাত্র তিনখানা। “কোমল গান্ধার” যখন দেখানো হয় তখন আমি কলকাতায় ছিলাম না। তারপর সে ছবি আর ব্যবসায়িক ভিত্তিতে দেখানো হয়নি। বাংলাদেশে তোলা “তিতাস –একটি নদীর নাম” এবং ঋত্বিকের শেষ ছবি “যুক্তি তক্কো আর গপ্পো” যখন প্রাইভেটলি দেখানো হয়েছিল, তখন আমার শ্যুটিংয়ের কাজ চলছিল। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি। যাইহোক “সুবর্ণরেখা” ছবির কথা মনে আছে। ঋত্বিক আমাকে নিজে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাঁর পাশে বসে দেখিয়েছিল।

“অযান্ত্রিক” থেকে শুরু করে শেষদিন পর্যন্ত অর্থাৎ এই ১৭-১৮ বছরে ঋত্বিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় হবার সুযোগ কখনও হয়নি – যাকে বলে বেশ বসে আলাপ করা, আড্ডামারা বা চলচ্চিত্রের নানান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা। সেই সুযোগ প্রায় আসেনি বললেই চলে। সত্যি বলতে কি ঋত্বিককে শেষ কবে সুস্থ দেখেছি সেটা চেষ্টা করে মনে করা কঠিন। তাঁর কাজ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি; কিন্তু যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছে তাঁদের মুখে শুনেছি যে, সে কাজ করার সময়ও অনেক সময়ই অসুস্থ থাকত। কিন্তু আমার কাছে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে যে তাঁর কোনো ছবি দেখে সেই অসুস্থতা এতটুকুও কখনও মনে হয়নি, এতটুকু অসুস্থতাও সেই ছবির মধ্যে সঞ্চারিত হয়নি। তাঁর বিষয়বস্তু যেরকম বলিষ্ঠ, তাঁর বলার কায়দার মধ্যেও সেরকম জোর ছিল। এটা একমাত্র সম্ভব হয় তখনই যখন একজন শিল্পীর মধ্যে বিশেষ শিল্পের আদবকায়দাগুলো একেবারে মজ্জাগত হয়ে থাকে। ঋত্বিকের মধ্যে সেটা ছিল এবং সেই গুণটুকু না থাকলে আমার মনে হয়না মহৎ শিল্পী হওয়া যায়। ঋত্বিককে তাই খুব কাছাকাছি না জেনেও, তাঁর ছবি যখনই দেখেছি, তখনই মনে হয়েছে এঁকে আমি খুব ভালো করে চিনি এবং এ আমার খুব কাছের লোক।

আর একটা কথা বলে আমি শেষ করব – ঋত্বিকের ছবির আর একটা বিশেষ গুণ… আমরা যারা প্রায় গত চল্লিশ বছর ধরে ছবি দেখেছি, তাদের মধ্যে তো প্রায় ত্রিশটা বছর কেটেছে হলিউডের ছবি দেখে, কেননা তার বাইরে কলকাতায় সে সময়টায় কিছু দেখবার সুযোগ ছিল না। উনিশশো পঁচিশ বা ত্রিশ থেকে শুরু করে প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বা ষাট অবধি আমরা হলিউডের বাইরে খুব বেশি ছবি দেখতে পারিনি। আমাদের সকলের মধ্যেই তাই কিছু কিছু হলিউডের প্রভাব ঢুকে পড়েছে। কিন্তু ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে সম্পূর্ণভাবে সে প্রভাব মুক্ত ছিল; তাঁর মধ্যে হলিউডের কোনো ছাপই নেই। এটা যে কি করে হয়েছে, তা এখনও আমার কাছে রহস্য রয়ে গেছে। যদি প্রভাবের কথা বলতে হয়, আমার মনে হয় ঋত্বিকের ছবিতে কিছুটা – কিছু কিছু সোভিয়েত ছবির প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কিন্তু সে প্রভাবটা – প্রভাব মানে সেখানে অনুকরণ নয়, কারণ ঋত্বিকের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর মৌলিকতায় এবং সেটা সে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিল। এই সোভিয়েত ছবির প্রভাব … এবং সংলাপে, বিষয়বস্তুতে, ছবির পরিসমাপ্তিতে নাটকের প্রভাব… তাঁর মধ্যে ছিল। এবং এই দুটো জিনিস দাঁড়িয়েছিল যে ভিত্তির উপর সেটা একেবারে বাংলার মাটিতে বসানো।

ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল – আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় এবং সেইটাই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।

( ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর পর ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়ার আয়োজিত স্মরণ সভায় সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া ভাষণ )
স্থান – সরলা মেমোরিয়াল হল।
তারিখ – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here