‘পথের পাঁচালী’ -র জন্য কোনোদিন কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য লিখিনি: সত্যজিৎ রায়

0

প্রশ্ন: ‘পথের পাঁচালী’ ছবির জন্য কোনোদিন কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য লেখেননি। চিত্রনাট্য লেখা শুরু করলেন কি করে ?

সত্যজিৎ রায়: চিত্রনাট্য সাহিত্য নয়। একটা বিশেষ আঙ্গিকে ঘটনার বিন্যাস, বক্তব্যের বিকাশ করার জন্য দৃশ্য-পরিকল্পনা ও উপাদানের সার্থক রূপায়নের জন্য সমস্ত করণীয় বিষয়গুলোর একটা সর্বাত্মক নির্দেশনামা। সাহিত্য নির্ভর চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রে; চিত্রনাট্যের কোনো অংশ সাহিত্যে না থাকলেও, চলচ্চিত্রের কাঠামো হিসাবে প্রতিটা দৃশ্যেরই কিছু মূল্য আছে।

সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘পথের পাঁচালী’ –র সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’ –ই যে ‘পথের পাচালী’ -র চিত্রনাট্যের উৎস তা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। এই বিশেষ সংস্করণটির জন্য আমাকে ছবি আঁকতে হয়েছিল। সেই কারণে বইটা খুঁটিয়ে পড়ার প্রয়োজন হয়। তার আগে অবশ্যি সিগনেটের স্ব্বত্বাধিকারী ও আমার বিজ্ঞাপনের আপিসের সহকারী ম্যানেজার দিলীপকুমার গুপ্ত অপু-কাহিনীর এই প্রথম পর্বের চলচ্চিত্র সম্ভবনা সম্পর্কে সচেতন করেন। দিলীপ গুপ্ত ওরফে ডি.কে ছিলেন ফিল্ম পাগল মানুষ। ‘পথের পাঁচালী’ ছবি হলে তাতে কী থাকবে না থাকবে, কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে, এমনকি কতকগুলো বিশেষ দৃশ্য কীভাবে তোলা হবে সে সম্বন্ধেও ডি.কে –র ভাবনার অন্ত ছিল না। বলা বাহুল্য আমি ‘পথের পাঁচালী’ ছবি করার সিদ্ধান্ত নেওয়াতে ডিকে আমাকে সবিশেষ উৎসাহিত করেন। যদিও আমার কল্পনায় ছবির চেহারা কেমন হবে সেটা আর তাঁকে বলিনি। মূল উপন্যাস আমি পড়ি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে।

ঋত্বিক এক রহস্যময় কারণে সম্পূর্ণভাবে হলিউড প্রভাব মুক্ত ছিল : সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll সাতাশ ll

‘পথের পাঁচালী’ করার আগেই আমি ‘ঘরে-বাইরে’ ও অন্যান্য কয়েকটি বাংলা গল্প-উপন্যাস যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিলাসমন’, শরদিন্দু বন্দ্যোপাদ্যায়ের “ঝিন্দের বন্ধী’ ইত্যাদির চিত্রনাট্য লিখি। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ -র জন্য কোনোদিন কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য লিখিনি। ছবির চেহারা কি হবে তা মোটামুটি মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি একটা স্কেচবুকে বেশ যত্ন সহকারে কমিক্সের ঢং-এ পরপর ছবি এঁকে ফেলি। যখন প্রডিউসারদের দোরে দোরে ঘোরা শুরু হল, তখন এই খাতা হল আমার সঙ্গী। প্রডিউসারদের চিত্রনাট্য শোনাবার একটা রেওয়াজ বহুদিন থেকেই চলে আসছে এবং আমাকেও বেশ কিছুদিন ধরে সে কাজটা করতে হয়েছিল। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গল্প বলিয়ে যেমন হোক না কেন, খুব কম প্রযোজকই যে ভালো গল্প শুনিয়ে সেটা তখনই আমি হাড়ে হাড়ে বুঝি। গল্পের শেষে সশব্দে হাই তুলে ‘তাহলে আপনার ছবিতে গান নেই’- এই উক্তি যে চিত্রনাট্যকারের প্রত্যাশায় কী পরিমাণ ঠান্ডা জল ঢালতে পারে সেটা যার অভিজ্ঞতা হয়নি সে বুঝবে না।

‘পথের পাঁচালী’ -র কোনো লিখিত চিত্রনাট্য না থাকার একটা কারণ অবশ্য এই যে, সংলাপ সমেত ছবির সম্পূর্ন চেহারাটি আমার মাথায় ধরা ছিল। একটা বিশেষ দৃশ্যকে কীভাবে ভাগ করে তোলা হবে সেটা শুটিং-এর আগে ক্যামেরাম্যানকে বুঝিয়ে দিতাম। টুকরো টুকরো এমন কিছু স্কেচ হয়তো খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে। ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্রের কাছে নাকি সিগারেটের প্যাকেটে আঁকা এমন কিছু স্কেচ রাখা আছে। সংলাপ অবশ্য অভিনেতাদের শুটিং-এর আগেই দিয়ে দেওয়া হত। আমি যে নিজে কোনোদিন সংলাপ লিখতে পারবো সে বিশ্বাস আমার তখনো হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে বিভূতিভূষণের সংলাপ সরাসরি বইয়ের পাতা থেকে তুলে অভিনেতার কন্ঠে সঞ্চারিত করতে কোনো বাধা নেই। আমার ছবির সংলাপ তাই বারো আনাই মূল উপন্যাস থেকে নেওয়া। সে সংলাপ বলতে অভিনেতাদের কখনো কোনো অসুবিধা হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here