‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের বারো আনা ঘটনাই ছবিতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নিঃ সত্যজিৎ রায়

0

সত্যজিৎ রায়ের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎ সত্যজিৎ।
নানান মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের দেওয়া সাক্ষাৎকার সংকলিত করে তা ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করছে কলকাতা টাইমস 24।

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll

প্রতি রবিবার
ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার।

পর্ব ll বত্রিশ ll

সংকলন: স্বর্ণাভ রায় চৌধুরী

প্রঃ শুটিং চলার সময় চিত্রনাট্যের প্রয়োজন অনুযায়ী ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস কিভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বতন্ত্র হয়ে উঠছিল ?
উঃ স্টুডিওতে যখন ছবি তোলা হয় তখন কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া হয় চিত্রনাট্যের প্রয়োজন অনুযায়ী। প্রাকৃতিক পরিবেশে শুটিং করলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেককিছুই চলচ্চিত্রকারদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। অনেক সময় এই পরিবেশ নতুন আইডিয়া জোগায় এবং তেমন আইডিয়ার স্মভবনা আছে বলেই পরিচালকে সবসময় সজাগ থাকতে হয়। অবশ্যি নতুন কোন আইডিয়া পূর্ব পরিকল্পিত কাঠামোয় সংগত ভাবে স্থান পেতে পারে কি না, সে বোধও পরিচালকের থাকা দরকার। ‘পথের পাঁচালী’ শ্যুটিং এর সময় এমন সব আইডিয়া উদ্ভবের একাধিক উদাহরণ আছে। অপু-দুর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্যের শুটিং –এর সময় হঠাৎ দেখা গেল চলে যাওয়া ট্রেনের কালো ধোঁয়া কাশের উপর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। এমন যে হবে তা আগে জানা ছিল না, অথচ লোভনীয় দৃশ্য। তৎক্ষণাৎ ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে শটটা নিয়ে নেওয়া হল। সেটাই শেষে হয়ে গেল ট্রেন দেখার দৃশ্যের শেষ শট।
তেমনই ছিল রবিশঙ্করের সেতারের সঙ্গে পুকুরের জলের উপর পোকার ঘোরা ফেরার দৃশ্য। যে গাঁয়ে শুটিং হচ্ছে সেখানে পুকুরের অভাব নেই, সেই সব পুকুরের ধারে মেঘলা দিন, রোদের আশায় আমাদের অনেক সময় কাটাতে হয়েছে। তখনই চোখে পড়ে পোকার এই গতিবিধি, আর ক্যামেরায় ক্লোজ-আপ লেন্স লাগিয়ে তখনই তুলে রাখা হয় এই দৃশ্য।

পরে মনে হয়েছে এগুলো ব্যবহারের জন্য ছবিতে একটা নিশ্চিন্ত মুহূর্তের দরকার। হরিহর এতদিনে কাজ পেয়েছে, এবার সে বাড়ি ফিরবে – চিঠিতে এই খবর পড়ে সর্বজয়ার হাসিমুখেই এই দৃশ্যের সূচনা। এর পরেই চরম আনন্দের মুহূর্ত আসে দুর্গার বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য। অবশ্যি তার পরেই দুর্গার অসুখ, সেই ভয়ংকর ঝড়ের রাত, আর দুর্গার মৃত্যু। তথাকথিত ঘাত-প্রতিঘাত সম্বলিত প্লটের অভাবে ঘটনার এই ওঠাপড়ার সাহায্যে সচেতনভাবে ছবিতে একটা ছন্দ আরোপ করা হয়েছিল। এ ছন্দ উপন্যাসে নেই। উপন্যাসে যেটা সবচেয়ে লক্ষণীয় ‘পথের পাচালী’ –র বিশেষত্বই সেখানে –সেটা হল গ্রামজীবনের নিস্তরঙ্গ মন্থর গতির একটা হুবহু প্রতিরূপ। সিনেমায় এ গতি অচল। সেখানে ছন্দের প্রয়োজন, উত্থান-পতনের প্রয়োজন – সেটা দর্শক অনুভব করতে পারবে। উদাহরণস্বরূপ পুজোর দৃশ্য আর গ্রামের যাত্রা মিলে যে আনন্দ পরিচ্ছেদ, তার পরেই অপু-দুর্গার আড়ি, আর পরেই প্রথম ট্রেন দেখার উল্লাস, আবার তার পরেই ইন্দিরের মৃত্যু, ইন্দিরের শবযাত্রা, হরিহর-সর্বজয়া-অপু-দুর্গার শোক।

‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের বারো আনা ঘটনাই ছবিতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি; সেই সঙ্গে চরিত্রও বাদ পড়েছিল অজস্র। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ বলতে লোকের মনে প্রথমেই যে সব দৃশ্য ভেসে ওঠে, তার অধিকাংশই ছবিতে স্থান পেয়েছে। একটি চরিত্রের ব্যাপারে একটা বড় রকম স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছিল; সে চরিত্র ইন্দিরঠাকুরণ।

সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার উপন্যাসে সাঁইত্রিশের পাতায় ঘটে ইন্দিরের তিরোধান। উপন্যাস হুবহু অনুসরণ করতে গেলে ছবি শুরু হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে ইন্দিরের মৃত্যু হওয়া উচিত। অথচ এমন একটি চরিত্রকে এত অল্প সময়ের জন্য পর্দায় দেখলে দর্শক হতাশ হতে বাধ্য। তাই ছবিতে ইন্দির মরে প্রথমার্ধের শেষ দিকে। বইয়ে অপুর তখন বয়স এক, ছবিতে ছয়। ভাই-বোনের এক সঙ্গে পিসির মৃতদেহ আবিষ্কারের দৃশ্য বইয়ে নেই। যে দেশের চিত্র সমালোচক মূল উপন্যাসের সঙ্গে তার চিত্ররূপ মিলিয়ে দেখার জন্য সদাব্যগ্র, এবং দুই এর মধ্যে সামান্যতম ফারাক দেখলেই খড়্গহস্ত, সেখানে ইন্দিরের এই দীর্ঘায়িত আয়ু কারো কোনো উষ্মার উদ্রেক করেনি; এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা।

 

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ছবির শেষ নিয়ে। হরিহরের ঘর ভেঙে গেল, আশা ভেঙে গেল, সে পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে সপরিবারে কাশীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। ইংরাজিতে যাকে বলে ডাউনবীট এন্ডিং। ট্রাজেডি তো বটেই, কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয় বলে দর্শককে তেমনভাবে নাড়া দেওয়ার সম্ভবনা কম। হরিহরকে গোছগাছ করতে দেখলেই দর্শক উঠি উঠি করবে। তাঁদের বসিয়ে রাখা যায় কীভাবে?

 

ইংরেজরা স্বভাবগত কারণেই মুভি ক্যামেরার সার্থকতম প্রয়োগে অপারগ: সত্যজিৎ রায়

ll সাক্ষাৎ সত্যজিৎ ll
পর্ব ll বত্রিশ ll

দুটি ঘটনা – একটি বইয়ে আছে, যদিও একটু অন্যরকম ভাবে – অন্যটি নেই – শেষ পর্যন্ত এই দৃশ্যটিকে মামুলি হতে দেয়নি। প্রথম ঘটনা হল, দুর্গার চুরি করা পুঁথির মালা হঠাৎ বেড়িয়ে পড়া। উপন্যাসে দুর্গা দু’বার চুরি করে, প্রথমবার পুঁতির মালা ও দ্বিতীয়বার সোনার কৌট। প্রথমটি চুরির অল্পক্ষণের মধ্যেই খোঁজাখুঁজিতে বেরিয়ে পড়ে। দ্বিতীয়টিকে অপু খুঁজে পায় নিশ্চিন্তিপুর ছেড়ে যাবার আগের দিন। ছবিতে কেবল পুঁতির মালাই রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রথম খোঁজায় সেটা পাওয়া যায়নি। অপু সেটা পায় বইয়ের মতোই কাশী রওনা দেওয়ার আগের দিন।
বলা বাহুল্য, ঘটনাটা অত্যন্ত জরুরি – শুধু খুঁজে পেলেই হবে না, পাওয়ার মুহূর্তটিকে ব্যঞ্জনাময় করা দরকার। তাই অপু তাকের উপর হাতড়াবার সময় যখন দুর্গার নারকোলের মালাটা ঠক্ করে মাটিতে পড়ে, তকন তার থেকে একটি মাকড়সা বেড়িয়ে স্ত্রস্তপদে পলায়ন করে। এই মাকড়সা এতদিন ঘর করেছে ঐ পুঁতির মালার সঙ্গে। এর পরে আসে চোরাই মাল ছুঁড়ে ফেলার দৃশ্য। বইয়ে আছে অপু ‘হাতের কৌটোটাকে একটান মারিয়া গভীর বাঁশবনের দিকে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল’। কিন্তু এইভাবে ফেলায় এই মালা যে আর কোনোদিন কারো হাতে পড়বে না। তার কোনো স্থিরতা নেই। প্রথমে আমি এই দৃশ্যটা এইভাবে দেখাব বলে কল্পনা করেছিলাম। কিন্তু একদিন শুটিং-এর অবসরে অন্যমনস্কভাবে পানা পুকুরে একটি ঢিল ফেলে এক আশ্চর্য ব্যাপার দেখে স্থির করি অপুও পুকুরেই মালা ফেলবে। তাই ছবিতে দেখা যায় মালা পড়া মাত্র পানার স্তর সরে গিয়ে একটি ফাঁক হয় আর পরমুহুর্তেই স্তর আবার জায়গায় ফিরে এসে ফাঁক বুঁজিয়ে দেয়। অর্থাৎ প্রকৃতি যেন এই বিষন্ন কাহিনীটিকে চিরকালের মতো নিজের বুকে লুকিয়ে ফেলছে।

দ্বিতীয় ঘটনা হল হরিহরের পরিত্যক্ত গৃহে সাপের প্রবেশ। সমস্ত ছবিতে সাপের কোনো ভূমিকা নেই বলেই বোধহয় এই দৃশ্য লোকের মনে দাগ কাটে। অপ্রত্যাশিত কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। যে বাড়ির সঙ্গে এত সুখদুঃখের কাহিনী জড়িত, সেই বাড়ি আজ থেকে হল সাপের বাসা।