শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, পৃথিবীতেই ওরা অন্য মতাদর্শ থাকতে দিতে চায় না: প্রতিবাদী ছাত্র সুরঞ্জন

0

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিতর্ক আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আগেই সমার্থক হয়ে উঠেছে। শেষ ৫ বছরে গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়ের থেকে রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারণে খবরের শিরোনামে এসেছে ভারতের এই অন্যতম উৎকর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়টি।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপির নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন গায়ক এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা থেকে আটকাতে বিক্ষোভ দেখায় বাম সংগঠনগুলো। বিক্ষোভ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে মারধোরও করে উগ্রবাদী বামসংগঠনের সদস্যরা।

সে ছবি মিডিয়াতে আসার পরই ওই দিন সন্ধ্যের সময় এবিভিপির সদস্যরা পাল্টা মারামারিতে জড়ায়। জেইউ ক্যাম্পাসে থাকা এসএফআইয়ের ইউনিয়ন রুম ভেঙে দেয় এবিভিপির ছাত্ররা, এমনটাই অভিযোগ।

এই ঘটনার পর থেকেই ফেসবুকে প্রাণহানির হুমকি পাচ্ছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপির সভাপতি সুরঞ্জন সরকার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসকমের মাস্টার্সের ছাত্র সুরঞ্জনের ফেসবুক প্রোফাইলে সৌমাল্য রায় নামের একজন লিখেছেন, ‘তোকে মেরে কেলিয়ে ফেলে দেওয়া হবে রে। তুই শুধু উইনিভার্সিটিটা যা।’

মনোজ সাহা নামে একজন লিখেছেন, ‘তোর বাবা বাবুল-কে যেমন করে মারা হয়েছে তেমন করে তোকেও মারা হবে।’ বামেদের মিছিলের ভিড়ের ছবি দিয়ে জয়দীপ ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘তুই একবার ক্যাম্পাসে ঢোক’। পাশাপাশি সুরঞ্জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে না দিলে তাঁরা ক্লাস করবেন না বলে উপাচার্যর কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মাসকম বিভাগের পিজি-টু-র পিনাকী ঢালি।

বিষয়টি নিয়ে সুরঞ্জন বলেন, ‘ শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নয় ওরা এই পৃথিবী থেকেই বিরুদ্ধ মতকে সরিয়ে দিতে চাই। আমাকে মারার হুমকি দিচ্ছে। এটার সঙ্গেই তো লড়াই। আমাদের লড়াই এই স্বৈরাচারী মতাদর্শের সঙ্গে। আমি ভয় পাই না ওদের। ‘ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বেশ পুরনো৷ অনেকেই অভিযোগ করেন বিরোধী মতাদর্শকে কোনভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে ঢুকতে দেয় না বামসংগঠনের সদস্যরা।

১৭ ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬ – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাডিক্যাল বাম সংগঠনের ছাত্রছাত্রীরা একটি মিছিল বার করে। যেখানে স্লোগান তোলা হয়, আফজল মাগে আজাদি, ছিন কে লেঙ্গে আজাদী। কাশ্মীর কি আজাদি, নাগাল্যান্ড কি আজাদী। এই স্লোগানগুলি সরাসরি ভারতীয় সংবিধানের ১৯/১ ধারার পরিপন্থী এবং দেশের জন্য থ্রেট।

৬ই মে ২০১৬, যাদবপুরের পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীর সিনেমা, ‘বুদ্ধা ইন আ ট্রাফিক জ্যাম’-এর স্পেশাল স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা করে এবিভিপি। সেই উপলক্ষ্যে ক্যাম্পাসে আসেন পরিচালক অগ্নিহোত্রী। সে সময়ইও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উগ্র বাম ছাত্রছাত্রীরা তার গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ে। পরিচালককে ধাক্কাধাক্কি করে। সঙ্গে থাকা অধ্যাপকদের মারধোর করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে।

২০১৮ মার্চে কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে কালি লাগায় ও ভাঙার চেষ্টা করে যাদবপুর নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনের কিছু দুষ্কৃতী। এরপর ৮ তারিখে যাদবপুরের লেনিন মূর্তিতে কালি লাগানোর চেষ্টা করে হিন্দু সংহতির ছাত্রছাত্রীরা। অভিযোগ সেই সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উগ্র বাম সংগঠনের ছাত্রছাত্রীরা পাঁচজন লোককে রাস্তায় ফেলে লাঠি দিয়ে পেটায় যার মধ্যে ৩ জন বৃদ্ধ লোক ছিলেন। যে ছবি সে সময় সোশ্যাল মিডিয়া সহ একাধিক সংবাদপত্রে বেরোয়।

তারপর এই বাবুল সুপ্রিয়কে মারধোরের ঘটনা। সুরঞ্জনের মতো এবিভিপির সদস্যরা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রশ্ন তুলছে, যারা বাকস্বাধীনতা, মতের স্বাধীনতা নিয়ে চিৎকার করেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্ত চিন্তার জায়গাতে বিরোধী মতের লোক আটকাতে মারপিট কেন করবে? এত ভয় কিসের?

পুরো বিষয়টি নিয়ে জাতীয়তাবাদী বিজেপিপন্থী সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট দীপ্তাস্য যশের বক্তব্য, ‘ আরএসএস বিজেপি ভীষণ খারাপ। ফ্যাসিবাদী৷ ‘বুদ্ধা ইন আ ট্রাফিক জ্যাম’ ফ্যাসিবাদী মুভি, কারণ ওটা নকশালদের নিয়ে তৈরি! তা এগুলো মানুষকেই (যাদবপুরের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের) বুঝতে দিন না! নাকি নিজেদের ভুয়ো মিথ্যে প্রোপাগাণ্ডার উপর আর ভরসা থাকছে না? তাই বাধ্য হয়ে তাদের গেটের বাইরে আটকে দিতে হচ্ছে? যাতে নিজেদের দেশবিরোধী প্রোপাগাণ্ডার অন্তিমস্থলগুলো টিকিয়ে রাখা যায়?’

ফেসবুকে এক এবিভিপি সমর্থক লিখেছেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বক্তব্য রেখে গেছেন কানহাইয়া কুমার, সুজন চক্রবর্তীর মতো বামপন্থী নেতারা। আবার এবছরই, পরিচালক আনন্দ পটবর্ধণের ডকুমেন্টরি ‘রাম কে নাম’ দেখানো হয়েছে যাদবপুর ক্যাম্পাসেই এবং অবশ্যই বাম-নকশাল ব্রিগেডের উদ্যোগে। সেক্ষেত্রে কোন সমস্যা হয়নি। বা তখন প্রশ্ন ওঠেনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি কেন? কিন্তু বিরুদ্ধ মতের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেই ঝামেলা, বিক্ষোভ মারপিট শুরু হয়৷’