আসলে আমরা কেউই ভাল নেই

0

রাজীব সরকার: সকালে পাড়ার মুখে বৌদির চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়ে হরি, নৃপেন, লাল্টু, পল্টু সহ অনেকের সঙ্গেই দেখা হত। এখনও দেখা হয়। তবে সবার মুখে মাস্ক, তাই চিনতে অসুবিধা হয়। কারোর মুখে হাসি নেই। কেমন যেন চিন্তাগ্রস্থ। বোঝা যায় ওরা ভাল নেই। সকাল হলেই যে মানুষটা আমাদের দেখতে পেলেই কাছে আসতো আর বলত “দাদা! একটা টাকা দে, চা খাব”। আমরা টাকা, চা দিতাম, আবার আমরা সবাই মিলে ক্ষেপাতাম। সেই মানুষটা আজকাল আর টাকা, চা কোনটাই চায় না। মানুষটা আর ভালো নেই।

বাজারে রতন আমাকে দেখলেই বলত ‘দাদা এদিকে আসেন! আমারটা জ্যান্ত মাছ। ঠকবেন না’। রতনের মতো মনা, অমিত, শেখর সহ বাজারের সব বিক্রেতারা কেমন মনমরা। আজ ওরা আমায় দেখেও ডাকে না। বোঝা যায় ওরা ভালো নেই। আমি প্রতিদিন যে বাসস্ট্যান্ডে বাস ধরতাম, সেখানকার বাসের স্টাটার মানুষটা গুমটির বাইরে এসে চুপ করে বসে থাকে। ভালো করে কথা বলে না। দেখে বোঝা যায় মানুষটা ভালো নেই। ভিআইপি রোডে ভাঙা বেঞ্চিতে ট্যারা পকেটমার স্বপন চুপ করে সারাদিন বসে থাকে আর দেখে কোনও এনজিও খাবার দেয় কিনা! দূর থেকে দেখে বোঝা যায়, না! ও ভাল নেই। বিখ্যাত এক তেলের মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীতে উঁচু পদে কাজ করা অভীক চাকরি নিয়ে খুব মানসিক চিন্তায়। বাড়িতে ছোট্ট মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে সুখের সংসার। না! সেও ভালো নেই।

যে মানুষটা কলেজস্ট্রিটে নিজের যৌবনে প্রায় অর্ধেকটা দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা বইয়ের বিখ্যাত দোকানের দোকানদার সুব্রত লকডাউনের নিয়মভঙ্গ করে, প্রাণের টানে নিউব্যারাকপুর থেকে সাইকেলে কলেজস্ট্রিটে নিজের দোকানটা একবারের জন্যে দেখতে এসে দোকানটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দোকান ঠিক দেখেও খুশী নয়। মানসিক চিন্তায় মগ্ন। না! সেও ভালো নেই। নামী লেখক বিনোদ চিন্তায় বিভোর। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার এবছরের আগামী পূজাসংখ্যার জন্যে লেখা জমা দেবার কোন তাগাদা নেই কারোর থেকেও। অদ্ভুত এক অনিশ্চয়তা তাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। না! সেও ভালো নেই। চৌরাস্তায় লচ্ছমনের ফুচকার দোকানটা আর নেই। খুব ঝাল দিয়ে প্রায়দিন আমি ফুচকা খেতাম। শুনলাম পরিযায়ী শ্রমিক তকমা গায়ে লাগিয়ে বৌ বাচ্চাদের নিয়ে কলকাতা থেকে পায়ে হেঁটে বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। কবে পৌঁচ্ছাবে জানা নেই। ওর বন্ধুরাও ভাল নেই।

তৃষার বাবার দোকানটা বন্ধ। বাড়িতে ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে সংসার চালায়। ভাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশুনার খরচ তারই মাথায়। কোভিড ১৯ এর জন্য ছাত্রছাত্রীরা তার কাছে পড়া বন্ধ রেখেছে। তাদের রেশন কার্ডটাও নেই। ফলে সরকারি ফ্রি রেশনও পাচ্ছে না। ব্যাঙ্কে অল্প জমানো টাকা ভেঙে ভেঙে খাওয়া চলছে। তৃষার মতো অসংখ্য গৃহশিক্ষক/গৃহশিক্ষিকারা যাদের ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে মাইনের উপর মাস চলে, তারা আজ আর কেউই ভাল নেই। পাঁচু সারাদিন রিক্সা চালিয়ে রাত্রে বাজার করে, মদ খেয়ে বাড়িতে ফিরে বৌকে মারতো। বৌও লোকের বাড়ি সারাদিন কাজ করে সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়াতো। তাদের কারোরই এখন আর কোনও কাজ নেই। তাই তারা কেউই ভাল নেই। সঞ্জু কলকাতার একটি বড় শপিং মলে মোবাইল কোম্পানীর শোরুমের ম্যানেজারের কাজ করে। লকডাউনের দিন থেকে শপিং মল বন্ধ। বাড়িতে স্ত্রী এবং বাচ্চা রয়েছে। কন্যা নামী ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশুনা করে। লকডাউন উঠলে কোম্পানী তখন থাকবে কিনা তার জানা নেই। চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার ভিতর দিন কাটছে। সঞ্জুর মতো মলে কয়েকশো কর্মী ও তাদের পরিবার গভীর চিন্তায়। তারা কেউই ভাল নেই।

ভোলা ময়রার দোকানে সকাল সন্ধ্যায় লাইন পড়ত। লকডাউনে ছাড় পাওয়ার পর থেকে দোকান খুললেও লোক খুব একটা আসে না। মনমরা হয়ে চুপ করে বসে থাকে। না! সেও ভাল নেই। ওই যে পাগলিমাসি প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাগুইআটির সাবওয়ের ভিতরে লোকের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাইত, সে এখন চুপ করে শুয়ে থাকে। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ তাকে খাবার দিয়ে যায়। তাই সে খায়। ভাল নেই সেও। রামচন্দ্রকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে ১৫ মাস জেল খাটিয়েছিল যে পুলিশ অফিসার, তাকে প্রায়দিনই লকডাউন ডিউটিতে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। তার বাড়িতে পরিবার কেমন আছে ফোনে খবর নিয়েও উৎকন্ঠা কাটছে না। তারাও চিন্তায় কেউ ভালো নেই।

পাড়ার ডাক্তার কাকিমা প্রায় ২৪ ঘন্টার বেশী হাসপাতালে কোভিড-১৯ এর আক্রান্তদের সেবা করে বাড়ি ফিরলে দেখেন চেনাজানা মুখগুলো কেমন অচেনা হয়ে গিয়েছে। এসব দেখে তার মনটাও ভালো নেই। বিভিন্ন অফিসের কর্মীদের যাতে চাকরি না যায় তার জন্য সংবাদপত্রে সংবাদ করা জাতীয় স্তরের সাংবাদিক অফিসে গিয়ে জানতে পারে তার এবং তার মতো আরও অনেকের লকডাউনের ভিতরেই চাকরিটা চলে গিয়েছে। কোন সংবাদপত্রে সে সংবাদ কোনদিনও ছাপাও হবে না। তার মতো অনেকেই আজ আর ভাল নেই। বেসরকারি বিদ্যুৎ দফতরের সৌমিত্র এমারজেন্সির কাজে অনেকের বাড়ি যেতে বিদ্যুৎ এর জন্য বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে। যেখানে পিপিই কিট পড়ে ডাক্তারদের অনেকের করোনা হচ্ছে, সেখানে ৫০ টাকার মাস্ক পড়ে তাদের করোনা আটকাতে হবে!!! তার পরিবারের এবং নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে তারাও চিন্তিত। তারাও ভাল নেই। আর আমি?? সত্যি!!!! আমিও ভালো নেই। আগামীকাল আমাকে ফ্রি রেশন পাওয়ার জন্য কুপন জোগাড় করতে যেতে হবে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here