“ভুলতে পারি নিজের নাম, ভুলব নাকো নন্দীগ্রাম” ‘রণভূমি’র প্রার্থী হয়ে পুরোনো ছন্দে মমতা

0

নন্দীগ্রাম : বঙ্গ রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফের নন্দীগ্রাম। ইতিহাস ঘাঁটলে নন্দীগ্রাম থেকেই পালাবদল হয়েছিল বঙ্গ রাজনীতির। দশবছর পর একুশের নন্দীগ্রামই ভোটের ফলাফল নির্ণায়ক কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নন্দীগ্রাম থেকে একুশের প্রার্থী খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চলতি বছরে ১৮ জানুয়ারি নন্দীগ্রামের সভা থেকেই নিজের পুরোনো রণভূমির প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মার্চে ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হতেই পাকাপাকি ভাবে নন্দীগ্রাম থেকে লড়ার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর উলটো দিকে প্রার্থী হয়েছেন তৃণমূলের দলবদলু বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এমনকি মুখ্যমন্ত্রীকে ‘হাফলাখ’ ভোটে হারানোর চ্যালেঞ্জও ছুড়েছেন শুভেন্দু। তাই স্বাভাবিকভাবেই একুশের মহরণে নন্দীগ্রাম ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে।

কিন্তু কেন মুখ্যমন্ত্রী ভবানীপুর ছেড়ে নন্দীগ্রামের প্রার্থী হলেন? জানুয়ারি মাসে নন্দীগ্রামে সভায় সেখানকার প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে একাধিক ব্যাখা উড়ছিল । বিজেপির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী ভবানীপুরে নিশ্চিত পরাজয় বুঝেই নন্দীগ্রামকে বেছেছেন। আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, একুশের হাই ভোল্টেজ এই নির্বাচনে নিজের পুরানো ‘রণভূমি’ তথা জমি ‘আন্দোলনের পীঠস্থান’ নন্দীগ্রামকে বেছে নেওয়া হলো দুদে রাজনৈতিকবীদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কৌশল। বিশেষ করে সেই সময় যখন দলবদলের হাওয়া চলছে রাজ্যজুড়ে। নন্দীগ্রামের পুরোনো বিধায়ক তথা ঘাসফুলের হেভিওয়েট নেতা শুভেন্দু এখন বিজেপিতে।মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী নিজে প্রার্থী হওয়ার রহস্য ফাঁস করলেন।

উল্লেখ্য, ভোটের নির্ঘন্ট বেজে গিয়েছে। ২৯১ আসনের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে ঘাসফুল শিবির। বাদ পড়েছেন ২৭ জন পুরানো বিধায়ক। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর নন্দীগ্রামেই প্রথম প্রচারে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসেবেই এদিন মুখ্যমন্ত্রী নন্দীগ্রামের মানুষের মধ্যে মিশে গেলেন। এদিন নন্দীগ্রামে তাদের ‘মেয়েকে’ প্রার্থী হিসেবে পেয়েই উচ্ছাসে ফেটে পড়েন। নন্দীগ্রামের বটতলা হেলিপ্যাড গ্রাউন্ডে কর্মিসভা থেকেই নন্দীগ্রামে প্রার্থী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীকে সাফ জানিয়ে দিলেন, সেফ সিটের খোঁজে নয়, মানুষের ভালবাসার টানেই নন্দীগ্রামে ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। স্বরণ করেছেন জমি আন্দোলনের সেই পুরোনো বাণী – “ভুলতে পারি নিজের নাম, ভুলব নাকো নন্দীগ্রাম।”

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “আমার তো ঘরের কেন্দ্র ছিল ভবানীপুর। আমাকে তো কিছুই করতে হত না। আমি তো ওখানেই থাকি। কিন্তু, আমি যেদিন শেষ এসেছিলাম, তখন নন্দীগ্রাম আসনটা খালি ছিল। তখন কিন্তু এখানে কোনও বিধায়ক ছিল না। তাই আমি তখন দেখতে চেয়েছিলাম এখানকার মানুষ আমাকে চায় কিনা। তেখালির সভা থেকে আপনাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলাম, আমি যদি এখানে প্রার্থী হই কেমন হয়? সেদিন মানুষের ভালবাসা আমাকে টেনে এনেছে। আপনাদের সেই ভালবাসা, সেই সাহস, সেই উদ্দীপনা, মা বোনেদের উৎসাহ আমাকে এখানে প্রার্থী হতে উৎসাহ দিয়েছে। আমার দু’চোখে শুধু নন্দীগ্রাম।”

নিজের প্রার্থী হওয়ার রহস্য ফাঁস করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন,”গ্রামের দিকে আমার একটা টান বরাবরই আছে। আমার এবার মাথায় ছিল, আমি হয় সিঙ্গুর, নাহয় নন্দীগ্রামে দাঁড়াব। কারণ এই দুটো হল আন্দোলনের পীঠস্থান।” মঙ্গলবার আরও একবার তৃণমূল কর্মীদের কাছে প্রার্থী হওয়ার জন্য অনুমতি চেয়ে নেন মমতা। বলেন, “যদি আপনারা মনে করেন আমার দাঁড়ানো উচিত নয়, তাহলে কাল আমি মনোনয়ন দেব না। যদি আপনারা মনে করেন, আমি আপনাদের ঘরের মেয়ে, তাহলেই আমি মনোনয়ন দেব। আপনারা বলুন কাল মনোনয়ন দেব তো?”

প্রত্যাশিতভাবেই দর্শকাসন থেকে বিপুল সাড়া পেয়েছেন মমতা। জনতাকে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন করেছেন, কি এখান থেকে দাঁড়াব তো? আপনারা ভোট দেবেন তো? দুই ক্ষেত্রেই সমবেত জনতা ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিয়েছে। কর্মীসভা শেষে নন্দীগ্রাম – ১ ও ২ ব্লকের কিছু নেতাকে নিয়ে সাংগঠনিক আলোচনা করবেন। আগামীকাল অর্থাৎ ১০ মার্চ নন্দীগ্রাম থেকে মুখ্যমন্ত্রী হলদিয়ায় মনোনয়ন পত্র জামা দেবেন।